বলিউডের চলচ্চিত্র ও ছোট পর্দার অত্যন্ত পরিচিত মুখ, প্রবীণ চরিত্রাভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী মুশতাক খান আর নেই। ২৪ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যানসারের সাথে লড়াই করার পর এই গুণী শিল্পীর অকালপ্রয়াণে পুরো বিনোদন জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই ও শেষ মুহূর্ত
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মুশতাক খান দীর্ঘদিন ধরেই ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে একপর্যায়ে তিনি ক্যানসার মুক্ত হয়ে সুস্থ জীবনে ফিরেও এসেছিলেন। তবে শেষরক্ষা হয়নি। মৃত্যুর মাত্র আট দিন আগে আচমকা তাঁর শরীরে আবার ক্যানসার নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে (রিল্যাপস করে)।
গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দ্রুত তাঁকে মুম্বাইয়ের নানাবতী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তিনি চিরবিদায় নেন।
মুশতাক খানের ব্যবসায়িক অংশীদার শিবম সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-কে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে তিনি মারা যান। এর আগে ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে তিনি ভালো হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আট দিন আগে ক্যানসারটি মারাত্মক আকারে ফিরে আসে এবং দ্রুত শেষ পর্যায়ে (অ্যাডভান্সড স্টেজ) পৌঁছে যায়। শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, কিন্তু ক্যানসারটি অত্যন্ত সংকটাপন্ন ধাপে চলে গিয়েছিল।”
‘ওয়েলকাম’ থেকে ‘হেরা ফেরি’: কালজয়ী চরিত্র ও অনন্য অভিনয়
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি সিনেমা ও টেলিভিশন জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন মুশতাক খান। প্রধান চরিত্রে অভিনয় না করলেও, যেকোনো দৃশ্যপটে তাঁর উপস্থিতি ছবির বিনোদনমূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিত। বিশেষ করে অসাধারণ ‘কমেডি টাইমিং’ ও অনন্য সংলাপ পরিবেশনার জন্য তিনি দর্শকদের কাছে আলাদা সমাদর পেতেন।
২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অনিশ বাজমি পরিচালিত ব্লকবাস্টার ছবি ‘ওয়েলকাম’-এ তাঁর অভিনীত ‘বালু’ চরিত্রটি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ক্যাটরিনা কাইফ, অক্ষয় কুমার ও অনিল কাপুরের মতো প্রথম সারির তারকাদের মাঝেও তাঁর সেই হকি খেলোয়াড়ের কৌতুকময় দৃশ্য এবং বিখ্যাত সংলাপ—“মেরি এক টাং নকিল হে, মে হকি কা বহুত বড়া খিলাড়ি থা…” আজ পর্যন্ত দর্শক ও নেটপাড়ার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা কমেডি ছবি ‘হেরা ফেরি’ (২০০০), ‘গদর: এক প্রেম কথা’ (২০০১), ‘হাম হ্যাঁয় রাহি পেয়ার কে’ (১৯৯৩), ‘জোড়ি নং ১’ (২০০১) এবং ‘রাউডি রাঠোর’ (২০১২)-এর মতো অসংখ্য ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে তাঁর চরিত্রগুলো দর্শক হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়।
ছোট পর্দা ও সাম্প্রতিক ব্যস্ততা
কেবল বড় পর্দাতেই নয়, ভারতীয় টেলিভিশনের জগতেও মুশতাক খান ছিলেন এক তুমুল জনপ্রিয় ও নিয়মিত মুখ। জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘আদালত’, ‘চমৎকার’ এবং ‘কুচ রং পেয়ার কে অ্যায়সে ভি’-তে তাঁর অভিনয় ছোট পর্দার দর্শকদের কাছে তাঁকে ঘরের মানুষের মতো পরিচিত করে তুলেছিল।
শারীরিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শেষ দিন পর্যন্ত কাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও নিষ্ঠায় কোনো খামতি ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া এবং বক্স অফিসে ব্যাপক সাড়া জাগানো ছবি ‘গদর ২’ (২০২৩), ‘বধাই দো’ (২০২২) এবং ‘স্ত্রী ২’ (২০২৪)-তেও তাঁর সাবলীল উপস্থিতি দেখা গেছে।
বিনোদন জগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি
মুশতাক খানের এই হঠাৎ চলে যাওয়ার খবর প্রকাশ পেতেই বলিউডের বহু সহশিল্পী, পরিচালক ও ভক্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পার্শ্বচরিত্র বা কমেডি রোলে অভিনয় করে কীভাবে একটি দৃশ্যকে সম্পূর্ণ নিজের করে নেওয়া যায়, মুশতাক খান ছিলেন তাঁর অনন্য উদাহরণ।
পর্দার সামনে এসে যেভাবে তিনি বছরের পর বছর দর্শকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, সেই অসাধারণ স্মৃতি আর অভিনয় নৈপুণ্য হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল অমলিন থাকবে।
