হাটে বাজারে চলচ্চিত্র

ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কিছু সিনেমা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরন্তন বা ‘এভারগ্রিন’ (Evergreen) শিল্পকর্মে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাটে বাজারে’ ঠিক এমনই একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বনফুলের (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) একটি আত্মজীবনীমূলক গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজবাস্তবতা, চিকিৎসা পেশার নৈতিকতা এবং মানবতাবোধের এক অনন্য দলিল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা তপন সিংহের সুনিপুণ পরিচালনা এবং অশোক কুমার ও বৈজয়ন্তীমালা বালির মতো মহাতারকাদের অনবদ্য অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

হাটে বাজারে চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্র

হাটে বাজারে চলচ্চিত্র: বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক মানবিক মহাকাব্য

 

নির্মাণের নেপথ্য কাহিনি ও সাহিত্যিক ভিত্তি

‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রটির সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর শক্তিশালী সাহিত্যিক ভিত্তি। সাহিত্যিক বনফুল নিজে পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। তাঁর নিজস্ব কর্মজীবন, চিকিৎসা পেশার অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করেই এই আত্মজীবনীমূলক কাহিনি রচিত হয়েছিল।

সাহিত্য থেকে সেলুলয়েডে রূপান্তর

পরিচালক তপন সিংহ সবসময়ই সাহিত্যের সফল চিত্রায়নে পারদর্শী ছিলেন। বনফুলের ছোট ছোট বাক্য, তীক্ষ্ণ চরিত্র বিশ্লেষণ এবং গ্রামীণ পটভূমিকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চিত্রনাট্যে রূপান্তর করেন। সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের যে মহৎ আদর্শ বনফুল তাঁর লেখনীতে তুলে ধরেছিলেন, তপন সিংহ তাকে সেলুলয়েডের ফিতায় এক জীবন্ত মহাকাব্যের রূপ দেন।

চরিত্র বিন্যাস ও অবিস্মরণীয় অভিনয়

এই চলচ্চিত্রের প্রতিটি চরিত্রই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। প্রবীণ এবং নবীন শিল্পীদের এক চমৎকার সংমিশ্রণ এই সিনেমাটিকে অভিনয়ের দিক থেকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

ডাঃ মুখার্জীর চরিত্রে অশোক কুমার

কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাঃ মুখার্জীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা অশোক কুমার। একজন আত্মত্যাগী, প্রশান্ত এবং মানবদরদী চিকিৎসকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল প্রশ্নাতীতভাবে সাবলীল। তাঁর পরিমিত অভিব্যক্তি এবং গম্ভীর অথচ স্নেহময় কণ্ঠস্বর চরিত্রটিকে এক ঐশ্বরিক মাত্রা প্রদান করেছিল।

ছিপলি চরিত্রে বৈজয়ন্তীমালা: এক ঐতিহাসিক অভিষেক

‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডের সেসময়ের শীর্ষ নায়িকা বৈজয়ন্তীমালা বাংলা সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেন। একজন সাধারণ, অসহায় কিন্তু স্বাধীনচেতা গ্রামীণ সবজি বিক্রেতা ‘ছিপলি’র চরিত্রে তাঁর গ্ল্যামারহীন, মাটির কাছাকাছি অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেছিল।

অজানা তথ্য: বৈজয়ন্তীমালা কেবল এই সিনেমায় চমৎকার অভিনয়ই করেননি, বরং তিনি নিজের কণ্ঠে একটি গানে প্লেব্যাকও করেছিলেন। তাঁর গাওয়া “চেয়ে থাকি চেয়ে থাকি” গানটি সেসময় দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে।

খলনায়ক লছমনলাল ও অন্যান্য পার্শ্বচরিত্র

গ্রামের প্রতিপত্তিশালী, লম্পট ও অত্যাচারী যুবক লছমনলালের চরিত্রে নাট্যব্যক্তিত্ব অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় ছিল মেরুদণ্ড হিম করা। তাঁর দুর্দান্ত স্ক্রিন প্রেজেন্স সিনেমাটির মূল দ্বন্দ্বকে (Conflict) তীব্রতর করেছিল।

এছাড়া তরুণ চিকিৎসক অনিমেষের চরিত্রে শমিত ভঞ্জ, নটুবাবুর চরিত্রে চিন্ময় রায় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছায়া দেবী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি সিনেমার প্রতিটি মুহূর্তকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।

কাহিনি সংক্ষেপ: মানবিকতা বনাম নিষ্ঠুরতার আখ্যান

‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে ডাঃ মুখার্জীকে কেন্দ্র করে, যিনি তাঁর চাকরিজীবনে মানুষের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে অসুস্থ স্ত্রী (শমিতা বিশ্বাস) ছাড়া আর কেউ নেই।

অবসর গ্রহণের পর তিনি শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন না করে, গ্রামীণ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি একটি ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র বা ডিসপেনসারি তৈরি করে গ্রামের বিভিন্ন ‘হাটে বাজারে’ উপস্থিত হন।

গল্পের মোড় ঘোরে যখন গ্রামের এক অসহায় ও দরিদ্র সবজি বিক্রেতা মেয়ে ছিপলিকে স্থানীয় লম্পট লছমনলাল ক্রমাগত হয়রানি করতে শুরু করে। ডাঃ মুখার্জী ছিপলিকে লছমনলালের হাত থেকে রক্ষা করেন, তাকে নিজের কাছে আশ্রয় দেন এবং একজন দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে তোলেন। ডাঃ মুখার্জীর এই নিঃস্বার্থ সমাজসেবায় অনুপ্রাণিত হয়ে সদ্য ডাক্তারি পাস করা তরুণ অনিমেষ এবং স্থানীয় নটুবাবু তাঁর কাজে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন।

তবে গল্পের পরিণতি অত্যন্ত ট্র্যাজিক ও গভীর বার্তাবাহী। লছমনলালের লালসার হাত থেকে ছিপলিকে চিরতরে রক্ষা করতে গিয়ে মানবদরদী ডাঃ মুখার্জীকে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। তাঁর এই আত্মত্যাগ সমাজকে নাড়িয়ে দেয় এবং মানবিকতার এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

কারিগরি উৎকর্ষ ও নেপথ্য কুশলী

একটি সফল চলচ্চিত্রের পেছনে কেবল অভিনয় নয়, বরং কারিগরি দিকগুলোর সমান অবদান থাকে। ‘হাটে বাজারে’ সিনেমাটি নির্মাণে সেসময়ের সেরা কুশলীরা যুক্ত ছিলেন।

কারিগরি বিভাগদায়িত্বপ্রাপ্ত কুশলী
প্রযোজনাপ্রিয়া ফিল্মস
কাহিনিবনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়)
চিত্রনাট্য ও পরিচালনাতপন সিংহ
চিত্রগ্রহণদীনেন গুপ্ত
শিল্প নির্দেশনা (Art Direction)কার্তিক বসু
সম্পাদনাসুবোধ রায়

দীনেন গুপ্তের সাদাকালো ক্যামেরায় গ্রামীণ হাটের কোলাহল, ধুলাবালি এবং প্রাত্যহিক জীবনের রুক্ষতা অত্যন্ত নান্দনিকভাবে ফুটে উঠেছিল। কার্তিক বসুর সেট ডিজাইন এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে, দর্শকদের কাছে এটি কোনো স্টুডিও বলে মনে হয়নি।

সংগীত ও আবহ: আত্মার খোরাক

তপন সিংহ নিজেই এই চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের অসামান্য ব্যবহার এই সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠে গীত গানগুলো সিনেমার আবেগকে শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে মানবসেবা এবং গ্রামীণ জীবনের সরলতার সাথে আবহসংগীতের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল।

স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা

মুক্তির পরপরই ‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রটি শুধু বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং সমালোচকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

  • জাতীয় পুরস্কার: ১৯৬৭ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা ‘রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক’ (National Film Award for Best Feature Film) লাভ করে এই সিনেমাটি।

  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ১৯৬৮ সালে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসব’-এ (Asian Film Festival) সিনেমাটি রৌপ্য পদক জয় করে, যা বাংলা সিনেমার জন্য এক বিরাট আন্তর্জাতিক সম্মান ছিল।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. ‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রটি কত সালে মুক্তি পায়?

‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রটি ১৯৬৭ সালে মুক্তি লাভ করে।

২. এই সিনেমার কাহিনি কার লেখা?

সিনেমাটি প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক বনফুলের (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) একটি আত্মজীবনীমূলক ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত।

৩. ‘হাটে বাজারে’ সিনেমার পরিচালক কে ছিলেন?

এই কালজয়ী সিনেমাটির চিত্রনাট্য রচনা এবং পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা তপন সিংহ।

৪. বৈজয়ন্তীমালা এই সিনেমায় কোন চরিত্রে অভিনয় করেন?

বলিউড অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালা এই সিনেমায় ‘ছিপলি’ নামক এক দরিদ্র ও স্বাধীনচেতা গ্রামীণ সবজি বিক্রেতার চরিত্রে অভিনয় করেন। এটি ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম বাংলা সিনেমা।

৫. ‘হাটে বাজারে’ চলচ্চিত্রটি কী কী উল্লেখযোগ্য পুরস্কার জিতেছে?

চলচ্চিত্রটি ১৯৬৭ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা ছবি হিসেবে ‘রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক’ লাভ করে এবং ১৯৬৮ সালে কম্বোডিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে রৌপ্য পদক অর্জন করে।

হাটে বাজারে চলচ্চিত্র । বাংলা চলচ্চিত্র

একনজরে:

  • মানবিক আখ্যান: ‘হাটে বাজারে’ মূলত একজন নিঃস্বার্থ চিকিৎসকের মানবসেবা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অনবদ্য গল্প।
  • দুর্দান্ত কাস্টিং: অশোক কুমারের প্রশান্ত অভিনয় এবং বৈজয়ন্তীমালার গ্ল্যামারহীন আত্মপ্রকাশ সিনেমাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল।
  • তপন সিংহের জাদু: সাহিত্যের নিখুঁত চিত্রায়ণ এবং সমাজবাস্তবতাকে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তপন সিংহ তাঁর মাস্টারপিস নির্মাণ করেছিলেন।
  • সর্বোচ্চ স্বীকৃতি: ১৯৬৭ সালের শ্রেষ্ঠ ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে স্বর্ণপদক জয় প্রমাণ করে যে, মানবিক মূল্যবোধের গল্প কখনো পুরোনো হয় না, তা দীর্ঘমেয়াদে প্রাসঙ্গিক (Evergreen) থেকে যায়।

Leave a Comment